বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:২৬ পূর্বাহ্ন
সড়ক দুর্ঘটনায় রাজীবের বিচ্ছিন্ন হাতের ছবি ২০১৮ সালের ৩ এপ্রিল দেশের মানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করেছিল। একই বছরের ২৯ জুলাই, শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী জাবালে নূর পরিবহনের বাসের চাপায় নিহত হলে শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। রাজীবের ঝুলে থাকা হাত এবং শিক্ষার্থীদের মৃত্যুর ঘটনা হাসিনার আমলে সড়ক পরিবহন ব্যবস্থার অব্যবস্থাপনার চিত্র ফুটিয়ে তোলে। তখনকার শিক্ষার্থী আন্দোলনের ফলে সরকার সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ পাস করে। কিন্তু আজও এই আইনটির পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা শাজাহান খানের কারণে আইনটি কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। হাসিনা সরকারের পতনের দুই মাস হতে চলেছে। তাই প্রশ্ন উঠছে, কেন এখনও পরিবহন সেক্টরে শৃঙ্খলা ফিরছে না?
বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি পরিবহন সেক্টরকে চাঁদামুক্ত, সন্ত্রাসমুক্ত এবং যাত্রীবান্ধব করে তোলার নানামুখী উদ্যোগ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। গত ৩ সেপ্টেম্বর জাতীয় প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় মালিক সমিতির নতুন কমিটির আহ্বায়ক মো. সাইফুল আলম এ ঘোষণা দেন। তবে এক মাসের মধ্যে সে ঘোষণার কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। তিনি ইনকিলাবকে বলেছেন, “আমাদের কাজ শুরু হয়েছে।” যদিও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ মাঝে মাঝে অভিযান চালাচ্ছে, কিন্তু অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধে তাদের পদক্ষেপ খুবই নগণ্য। ৬ লাখ অবৈধ ব্যাটারি রিকশা ও ইজিবাইকের মধ্যে থেকে ২০০-৩০০ আটক করে পুলিশ কঠোরতার ইঙ্গিত দেয়, যা অনেকটাই হাস্যকর।
ঢাকা এখন যানজটের নগরী হয়ে দাঁড়িয়েছে। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত যানজটের যন্ত্রণা থেকে মুক্তির কোনো উপায় নেই। গাড়ির গতি বাড়াতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। রাজধানীর অফিস এলাকা, বিমানবন্দর সড়ক, ভিআইপি সড়ক, ফ্লাইওভার, এক্সপ্রেসওয়ে—সব জায়গাতেই গাড়ির লাইন। উত্তরা, যাত্রাবাড়ী, গাবতলী, ডেমরা কিংবা বসুন্ধরার তিনশ’ ফিট রাস্তায় যানজটের দৃশ্য এক সারি। স্বৈরাচারী হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর ট্রাফিক পুলিশের অনুপস্থিতিতে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরার চেষ্টা হলেও, শিক্ষার্থীরা রাস্তা থেকে উঠার পর রাতারাতি যানজটের যন্ত্রণা বেড়ে গেছে। বর্তমানে এই পরিস্থিতি অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে।
সড়ক পরিবহন সংশ্লিষ্ট মালিক, নেতা, শ্রমিক এবং ভুক্তভোগীদের মতে, রাজধানীর যানজটের প্রধান কারণ হলো যানবাহনের অতিরিক্ত চাপ। এর মধ্যে রয়েছে ৪ লাখ বৈধ রিকশা, ৫ লাখ অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশা, ১ লাখ অবৈধ ইজিবাইক, ১ লাখ ৩৪ হাজার অ্যাপসভিত্তিক যানবাহন, ১ লাখ ঢাকার বাইরের সিএনজি অটোরিকশা, ১২ লাখ মোটরসাইকেল এবং রেজিস্ট্রেশনভুক্ত ২৫ লাখ বিভিন্ন যানবাহন। এসব যানবাহনের মধ্যে সবচেয়ে সমস্যা সৃষ্টি করে যাত্রীবাহী বাস এবং মোটরসাইকেল। বাসগুলো নিয়মকানুন মানে না, যেখানে সেখানে যাত্রী ওঠানামা করে। সিগনাল অমান্য করে, একাধিক বাস একসাথে দাঁড়িয়ে রাস্তায় ব্যারিকেড সৃষ্টি করে। এসব বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য পরিবহন শ্রমিকদের দায়ী করা হচ্ছে, যাদের অধিকাংশই শাজাহান খানের অনুগত। অনেকের ধারণা, তারা ইচ্ছাকৃতভাবে এই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। তাদের নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন জানান, সড়কে শৃঙ্খলা ফিরবে কীভাবে? বর্তমানে আইন মান্যকারী মানুষের সংখ্যা কমেছে এবং অমান্যকারী বেড়েছে। আইন সবার জন্য। দায়িত্ব চালক ও পরিবহন সেক্টরের লোকদের উপর পড়লেও, পথচারী বা যাত্রীদের দায়ও রয়েছে। ফুটওভার ব্রিজ থাকা সত্ত্বেও ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হচ্ছে।
একজন পুলিশ কর্মকর্তা মন্তব্য করেছেন, হাসিনার আমলে ডিএমপি কমিশনারের উপরি আয়ের অন্যতম উৎস ছিল পরিবহন সেক্টর। প্রতিমাসে পরিবহন খাতে চাঁদাবাজির কোটি টাকা কমিশনারের পকেটে যেত। এখন সেই উপরি আয় বন্ধ। ট্রাফিক পুলিশও উপরি আয় বন্ধ হওয়ার কারণে কাজের প্রতি উৎসাহ পাচ্ছে না। ঢাকা অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মো. হানিফ খোকন বলেন, ট্রাফিক পুলিশ চাইলে একদিনেই রাজধানীতে শৃঙ্খলা ফেরাতে পারে। সেক্ষেত্রে অবৈধ রিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা, ঢাকার বাইরের সিএনজি অটোরিকশা এবং ফুটপাত উচ্ছেদ করতে হবে। তাহলে শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবহন খাতের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা, পুলিশ, পরিবহন মালিক এবং শ্রমিকদের মধ্যে দুর্নীতির একটি দুষ্ট চক্র গড়ে উঠেছে। এই চক্রের স্বার্থ পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা নয়। এই প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের জন্য সড়কে সুশাসন প্রতিষ্ঠা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারের উচিত হবে এই দুষ্টচক্রকে ভেঙে আরও কঠোর হতে। প্রয়োজনে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীনে নতুন কমিটি গঠন করতে হবে। তা না হলে শাজাহান খানের অনুসারী শ্রমিকরা নগরবাসীকে অতিষ্ঠ করে সরকারের অর্জনগুলোকে ম্লান করে দিতে পারে।